শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

তীব্র গ্যাস সংকটে সীমাহীন দুর্ভোগ

শিল্পকারখানায় কমেছে উৎপাদন

দুর্ভোগের পাশাপাশি বেড়েছে ক্ষোভ

স্টাফ রিপোর্টার : তীব্র গ্যাস সংকট চলছে সারাদেশে। শুধু শিল্পকারখানাতেই নয় বাসা বাড়িতে এসংকট চরম আকার ধারণ করেছে। কোন কোন স্থানে দিনে রাতে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত গ্যাস না থাকার খবর পাওয়া গেছে। সংকট বেড়ে যাওয়া মানুষের দুর্ভোগ যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে ক্ষোভ। শীতকালে এমনিতেই প্রতি বছরই গ্যাস সংকট দেখে দেয়। তবে এবার শীতকালের পাশাপাশি একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় সমস্যা বেশি হচ্ছে। দুটি টার্মিনালে মধ্যে একটি বন্ধ অপরটি চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে না পারার কারণে সংকট আরো বেড়েছে।
এদিকে খোজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে বেশ ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। অনেকে মাটির চুলায় রান্না করতে বাধ্য হচ্ছেন। মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য শনিবার পর্যন্ত গ্যাসের স্বল্প চাপ থাকার কথা থাকলেও সেটি এখনও স্বাভাবিক হয়নি। গতাকল রোববার (৫ জানুয়ারি) রাজধানীর গ্রিনরোড, মহাখালী, আদাবর, মৌচাক, নাজিরাবাজার, নয়াবাজার, ধলপুর, কাঁঠালবাগান, মগবাজার, কল্যাণপুর ও মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকট রয়েছে।
 à¦—ত à§©à§§ ডিসেম্বর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, à§§ জানুয়ারি সকাল ৯টা থেকে ৪ জানুয়ারি  সকাল ৯টা পর্যন্ত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য মহেশখালীস্থ এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত এলএনজি ফ্লোটিং স্টোরেজ রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) থেকে মোট ৭২ ঘণ্টা আরএলএনজি সরবরাহ বন্ধ থাকবে। এ সময়কালে অপর এফএসআরইউ (মহেশখালী ভাসমান এলএনজি) দিয়ে দৈনিক প্রায় ৫৭০-৫৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। এর ফলে বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক প্রায় ১৫০-১৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হ্রাস পাবে। এছাড়াও অন্যান্য খাতে প্রায় দৈনিক প্রায় ৫০-৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হ্রাস পাওয়ার কারণে দেশের কোনো কোনো এলাকায় গ্যাসের স্বল্প চাপ বিরাজ করবে বলেও জানিয়েছিল পেট্রোবাংলা।
 à¦¤à¦¬à§‡ রোববার রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, বাধ্য হয়ে ইট পাথরের দালানে মাটির চুলায় রান্না করতে হচ্ছে অনেককে। কেউ আবার নিয়েছেন সিলিন্ডার গ্যাস। ভুক্তভোগীরা বলছেন, সারাদিন পর মধ্যরাতে গ্যাসের দেখা মেলে, তাতে পানিও গরম হয় না অনেকের। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান চান তারা।
এদিকে গ্যাস সংকট বাসাবাড়ি, সিএনজি স্টেশন, শিল্প-কলকারখানা সর্বত্র একই অবস্থা। রাজধানীর অধিকাংশ এলাকার বাসাবাড়িতে সকাল ৭টার পর থেকে দিনভর চুলা জ্বলছে না। বাধ্য হয়ে অনেকে মধ্যরাতে জেগে রান্নার কাজ সারছেন। এ অবস্থায় তিতাসের পাশাপাশি এলপিজি সংযোগও নিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক গ্রাহক। পেট্রোল পাম্পে গ্যাসের চাপ না থাকায় যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে। একটি গাড়ির গ্যাস নিতে কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা লাগছে। গ্যাস না থাকায় রাস্তার মাঝখানে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অনেক গাড়ি। ফলে রাজধানীতে দেখা দিয়েছে যানজট। গণপরিবহন সংকটে বেড়েছে জনভোগান্তি।
গ্যাসের চাপ না থাকায় অনেক শিল্প-কারখানা দিনে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। গাজীপুর, সাভার, কোনাবাড়ী, নারায়ণগঞ্জসহ সারা দেশের শিল্পাঞ্চলে চলছে এই সংকট। শিল্পমালিকরা বলছেন, একদিকে ডলার ক্রাইসিস অন্যদিকে গ্যাস সংকট চলতে থাকলে এই সেক্টরে শিগগিরই বড় বিপর্যয় নেমে আসবে। উৎপাদন কমে আসায় নিত্য ব্যবহার্য পণ্যের সংকট বাড়ার সঙ্গে পালস্না দিয়ে দাম বাড়বে। এতে উর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। পাশাপাশি রপ্তানি বাণিজ্যও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। যা রিজার্ভের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
পেট্রোবাংলা বলছে, দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস খাত চলছে রেশনিং (এক খাতে সরবরাহ কমিয়ে অন্য খাতে দেওয়া) করে। দেশে দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে ৩০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। কোনো কারণে সরবরাহ এর চেয়ে কমলেই বেড়ে যায় সংকট।
গ্যাস সংকট নিয়ে চলমান এ ভোগান্তির মধ্যেই রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা টার্মিনাল পহেলা জানুয়ারি সকালে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতিদিন গ্যাসের সরবরাহ আরও ৩৫০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমেছে। এতে রেশনিং করে গ্যাস সরবরাহের সিডিউলও এলোমেলো হয়ে গেছে।
তিতাস গ্যাসের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, শীতকাল এলেই দেশে গ্যাসের সংকট তৈরি হয়। পাইপলাইনে কনডেন্সড জমে গ্যাসের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। দেশে গ্যাস উৎপাদন হ্রাস, ডলার সংকটে এলএনজি আমদানি না হওয়ার পাশাপাশি চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে দেশে গ্যাসের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। সেইসঙ্গে একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই সংকট আরও বেড়েছে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, দুটি টার্মিনালের একটি শিডিউল রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চার দিন বন্ধ রাখা হচ্ছে। এতে এলএনজি সরবরাহ কমেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই গ্যাসের সংকট বেড়েছে। অপর টার্মিনাল সামিটের সর্বোচ্চ সরবরাহেও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তীব্র গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন কতটা কমেছে, সে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে রীতিমত আঁতকে উঠতে হয়েছে। বেশিরভাগ শিল্প মালিকরা জানিয়েছেন, তাদের উৎপাদন ন্যুনতম ৩৫ শতাংশ কমেছে। গ্যাস সংকটে কোনো কোনো শিল্পকারখানা বিকল্প শক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে বাড়তি খরচ করছে। উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় উৎপাদিত পণ্য বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
জানা গেছে, গাজীপুরের একটি কম্পোজিট মিলসে দৈনিক সুতা উৎপাদন সক্ষমতা ৮৫-৯০ টন। তবে গ্যাস-সংকটের কারণে সক্ষমতার তুলনায় ৩০-৪০ শতাংশ কম উৎপাদন হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, গ্যাস-সংকটের কারণে উৎপাদন কম হওয়ায় খরচ বেড়ে যাচ্ছে। তাতে বড় অঙ্কের লোকসান হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, গ্যাসের সরবরাহ না বাড়ালে অনেক শিল্পকারখানা ধীরে ধীরে রুগ্ন হয়ে যাবে। তাতে কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এই কম্পোজিট মিলসের মতো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পকারখানাও তীব্র গ্যাস-সংকটে ভুগছে। বস্ত্রকল, সিরামিক ও ইস্পাত খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, গ্যাস-সংকটে উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। এতে বড় ধরনের লোকসানে পড়ছে বিভিন্ন শিল্পকারখানা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ভবিষ্যতে ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকি এড়ানো অনেকের জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে।
এদিকে আবাসিকে গ্যাস সংকটের কথা স্বীকার করছে তিতাস কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, শীতে সঞ্চালন লাইনে সমস্যার কারণেই এই সংকট। ঠান্ডা কমে গেলে আবাসিকে গ্যাস সংকট কেটে যাবে বলে দাবি করেন তিতাসের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। যদিও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা অনেকেই এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তাদের ভাষ্য, সামগ্রিকভাবে গ্যাস সংকট না কাটলে আবাসিকে সরবরাহ বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কেননা, শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বাসাবাড়ি ও গ্যাস স্টেশন- সবখানেই গ্যাস রেশনিং করা হচ্ছে।
গত কয়েকদিন ধরে রাজধানী জুড়ে গ্যাসের যে হাহাকার চলছে, তা রীতিমত ক্ষোভে পরিণত হয়েছে। শনিবার যাত্রাবাড়ি, খিলগাঁও, বনশ্রী, রামপুরা, বাসাবো, সবুজবাগ, মিরবাগ, মধুবাগ, মগবাজার, সেগুনবাগিচা, পুরান ঢাকা, মোহাম্মদপুর, মিরপুরসহ রাজধানীর অন্তত দুই ডজন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে সবখানেই গ্যাসের চুলা টিমটিম কওে জ্বলছে। অনেকেই লাকড়ির চুলায় রান্না করছেন। কেউ হোটেল থেকে খাবার কিনে আনছেন। একই অবস্থা সিএনজি ফিলিং স্টেশনও। শুধু রাজধানীতেই নয়, এর আশপাশে গ্যাস সংকট চরম আকার নিয়েছে। চুলা না জ্বলায় অনেক পরিবারই বিকল্প বেছে নিয়ে রান্নার কাজ সারছে।? ভাত, ডিম ভাজি, বেগুন ভাজি আর ডাল রান্নায় লেগেছে তিন ঘণ্টা।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, প্রতিবছর শীতের সময় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। কিন্তু এবারের অবস্থা আগের চেয়েও খারাপ। ভোরে উঠেও রান্নার কাজ সারতে যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে। আর সকাল সাতটা বাজলেই গ্যাস চলে যাচ্ছে। অনেক সময় বাধ্য হয়ে ইলেকট্রিক চুলায় রান্নার কাজ করতে হচ্ছে।
দুপুর বারোটায় শ্যামপুরের এক বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় রান্নার আয়োজন সেরে গ্যাসের অপেক্ষায় গৃহিনী। চুলায় নিভু নিভু আগুন। তাতে রান্নার কাজ চলছে না। কখন গ্যাস আসবে সেই অপেক্ষায় থাকেন গৃহিনীরা। এ এলাকার বাসিন্দা সোহানা পারভীন জানান, একদিন ভাত রান্না করেছি দেড় ঘণ্টা ধরে। ১১টার পর গ্যাসের চাপ এত কমে যায় যে পানিও গরম করা যায় না। আড়াইটার পর চাপ কিছুটা বাড়ে।
গোপীবাগ থেকে দর্পন বর জানান, সকালে নাস্তার পরই গ্যাস চলে যায়। আসে বিকালের দিকে। তাই সকালেই দুপুরের রান্না শেষ করতে হয়।
শনির আখড়ার এক হোটেল মালিক জানান, ভোরে উঠেই রান্না শুরু করি। সকালের নাস্তাটা হয়ে যায়। কিন্তু দুপুরের রান্না করতে হয় সিলিন্ডার দিয়ে।
চিটাগাং রোডের স্টাফ কোয়ার্টার থেকে ওয়ায়েস মোহম্মদ মহিউদ্দিন জানান, আমার বাসায় ফজরের সময় সারাদিনের রান্না শেষ করতে হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমতে থাকে। সন্ধ্যা পর্যন্ত নিভু নিভু চলে।
মিরপুর-২ এর রেশমা বেগম জানান, প্রতিদিনই ১১ থেকে ২টা পর্যন্ত চাপ কম থাকে। আদাবরের নূসরাত জাহান নিশা জানান, প্রি-পেইড মিটার ব্যবহার করছি। তারপরও গ্যাসের চাপ একেবারেই থাকে না আজকাল। রামপুরার মাসুদা জলি বলেন, সকাল ৭টা থেকে ৩টা পর্যন্ত গ্যাসের দেখা পাই না।
বনশ্রীর মিশু আলাম বলেন, গ্যাসের এই সমস্যার কি সমাধান হবে না? না হলে আমাদের গ্যাস বিল কম নেওয়া হোক।
এদিকে গ্যাসের চাপ কম থাকায় সঙ্কট চলছে সিএনজি ফিলিং স্টেশানেও। রাজধানীর অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনই বন্ধ। যেগুলো খোলা, সেখানে গাড়ির দীর্ঘ লাইন।
রোববার দুপুরে রায়েরবাগ একটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে কথা হয় কয়েকজন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকের সঙ্গে। সাইফুল ইসলাম নামের একজন বললেন, 'গ্যাসের চাপ থাকলে ৩০০ টাকার নিই। চাপ কম থাকলে ৮০ টাকারও গ্যাস ঢোকে। সিরিয়াল ধরে গ্যাস নিতে নিতে দিনের বড় অংশ চলে যায়। দেড়-দুই ঘণ্টা লাইনে থেকে এভাবে তিনবার গ্যাস নিতেই দিনের অর্ধেক সময় পেরিয়ে যায়। যাত্রী নিয়ে ট্রিপ মারবো কখন।'

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ